ভ্রমণ - গৌতম বুদ্ধার জন্মস্থান লুম্বিনি

বেড়াতে আমি ভীষণ ভালবাসি । কাছে পিঠে দেশে বিদেশে যে কোন জায়গায় ঘুরতে আমার ভাল লাগে। বেড়ানোর জন্য নেপাল আমার বেশ পছন্দের দেশ । পাহাড় ভাল লাগে বলেই হয়ত পাহাড়ি এই দেশটাকে এত ভাল লাগে ।

পাহাড়ি দেশ হলেও নেপালেও কিছু সমতল অঞ্চল আছে । তেমন ই এক স্থান হল লুম্বিনি । নেপালের তরাই অঞ্চলে রুপান্দেহি জেলায় লুম্বিনি অবস্থিত । বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জন্মভুমি। লুম্বিনি সিদ্ধার্থ গৌতমবুদ্ধ জন্মস্থান, গৌতমবুদ্ধ একজন আলোকিত মানুষ। এটা একটি তীর্থ স্থান, সকল বিদ্যাপিঠ থেকে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধ অনুসারী এই স্থানে তীর্থে আসেন ।

সম্রাট অষোক ২৪৫ খৃষ্টপূর্বে এখানে স্তম্ভ নির্মান করেন । পবিত্র হ্রদ, পুস্করনী, যেখনে মায়াদেবী বুদ্ধের মা জন্মগ্রহণ করেন সন্তান জন্মদেয়ার পূর্বে, এসব কিছুই এখানে অবস্থিত। কাঠমান্ডু থেকে লুম্বিনীতে বাসে যাতায়াত করা যায়। আড়াই হাজার বছর আগে লুম্বিনী গ্রামে সিদ্ধার্থের জন্ম হয় । সিদ্ধিলাভ করে সিদ্ধার্থ হন গৌতমবুদ্ধ।

বুদ্ধের জন্মের প্রায় ৭শো বছর পরে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২৪৯ সালে সম্রাট অশোক বুদ্ধের জন্মস্থানকে স্মরণীয় করতে নির্মাণ করেন অশোকস্তম্ভ । লুম্বিনীতেই রয়েছে অশোকস্তম্ভ। লুম্বিনীতে দেখবেন পুষ্করিণী, মায়াদেবীর প্রাচীন মূর্তি, বৌদ্ধমন্দির, থাই মানাস্ট্রিসহ সবুজ ঘাসে-ছাওয়া প্রান্তর । এখানে হাজারো বৌদ্ধধর্মের লোকজন আসা-যাওয়া করে। বর্তমানে লাম্বিনিতে বহুদেশ তাদের শিল্পকলা ও সংস্কৃতির চিত্র তুলে ধরেন । এখানে ধর্মীয় অনুসারিদের থাকার জন্য মন্দিন নির্মান করা হয়েছে।

যারা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন তাদের অবশ্যই ভাল লাগবে লুম্বিনি। আর বৌদ্ধ ধরমালম্বিদের কাছে তো এটা তীর্থ স্থান । জাতিসংঘ লুম্বিনি কে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করেছে।



কাঠমান্ডু থেকে লুম্বিনি যেতে সময় লাগে প্রায় দশ ঘণ্টা । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সন্ধ্যা ৬ টায় বাস এ উঠে পৌঁছেছিলাম পরেন দিন সকাল পৌনে দশটায় । আসলে বিরতিহীন ভাবে একই গতিতে গাড়ি চালালে হয়ত দশ ঘন্টায় যাওয়া যায় কিন্তু তা তো সম্ভব না । কাঠমান্ডু থেকে বাস যাবে ভইরবা পর্যন্ত, বাকিটা অটো বা অন্য উপায়ে যেতে হবে । কিন্তু আমরা কয়েকজন (নেপালি সহযাত্রী সহ) মিলে ড্রাইভার এর সাথে চুক্তি করলাম সে আমাদের লুম্বিনি পর্যন্ত পৌঁছে দেবে ।

সন্ধ্যা সাতটায় বাস ছাড়ার পর রাত এগারোটায় আমরা পৌঁছলাম এক ধাবাতে ।এখানে রাতের খাবার আর ফ্রেশ হবার জন্য একঘন্টার বিরতি ।কেন যেন ভাত বা রুটি খাওয়ার রুচি হল না তাই চিপস,বিস্কিট আর মাউন্টেন ডিউ কিনে আমরা বাসে এসে বসলাম ।

সারারাত ভ্রমন করার পর সকাল ৮ টা নাগাদ পৌছা লাম ভইরবা তে। এখানেই আসলে যাত্রা শেষ হবার কথা কিন্তু ড্রাইভার আমাদের সহ আর তিনজনকে পৌঁছে দিবে লুম্বিনি পর্যন্ত । সবাই নাস্তা খাওয়ার জন্য নেমে গেল । আমাদের আর নামতে ইচ্ছা করলো না । এরপর প্রায় পৌনে নয়টার দিকে আবার বাস ছাড়ল এবং পৌনে দশটায় এসে পৌঁছলাম লুম্বিনি।

আমার দেখা নেপালের অন্যান্য শহর থেকে লুম্বিনি একদমই আলাদা । যেদিকে চোখ যায় দেখি সমতল ভূমি। তাপমাত্রাও বেশ চড়ার দিকে । তরাই অঞ্চল বলেই আবহাওয়া অনেকটা আমাদের মতই ।

আমরা যে হোটেল এ উঠলাম তা সংরক্ষিত স্থান অর্থাৎ মন্দিরের অনেক কাছে। হোটেল এ প্রচুর পর্যটক । বেশির ভাগ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশ গুলো থেকে এসেছে । দক্ষিন কোরিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড এর অনেক পর্যটক দেখলাম আর চিনের এক ফুটবল দল । হোটেলটা বিশাল বড় । অনেকখানি জায়গা নিয়ে তৈরি করা ।

ক্লান্তিতে তখন আমাদের অবস্থা খুব একটা ভাল নয় ।রুম এ গিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে অবসন্ন শরীরে দিলাম এক ঘুম । ঘুম ভাঙল এগারো কি সোয়া এগারোটায় । আমরা একবারে তৈরি হয়ে একটু তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়ে গেলাম। ভিতরে না গিয়েও বুঝতে পারলাম যে পুরা জায়গাটা অনেক বিশাল। আমরা একটা রিকশা ভাড়া করলাম পুরা জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য। এখানে চার ধরনের প্রবেশ মূল্য আছে। নেপালিদের জন্য, ভারতীয়দের জন্য, সার্ক ভুক্ত দেশ সমুহের জন্য আর পশ্চিমাদের জন্য ।

আমরা একটা রিকশা ভাড়া করলাম পুরা জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য। এখানে রিকশা ভাড়ার সিস্টেম টা বেশ মজার। ঘুরতে হলে দিতে হবে পাঁচশত নেপালি রুপি আর নাহলে পায়ে হেঁটে চলা ছাড়া উপায় নাই।ভাড়া প্রথমে বেশি মনে হলেও ঘুরার পর ভাবলাম ঠিক ই আছে । এছাড়া এই রিকশা চালক আগামী দুই দিন আর রিকশা চালাতে পারবে না । কারন শহর করতিপক্ষ অনেক অনেক রিকশা নামানোর অনুমতি দেয় না । তাই পালা করে চালাতে হয় আর অন্যান্য দিন হয় কৃষিকাজ, দোকানদারি বা অন্য কোন কিছু। ব্যাবস্থাটা আমার বেশ লাগলো ।

রিকশা চালক আমাদের প্রধান ভবন বা স্থাপনা যেখানে মায়াদেবির মন্দির তার গেটে নামিয়ে দিল । এখানে আরেক দফা টিকেট চেক করার পর প্রবেশ করলাম ভিতরে। এখানেই আছে রানি মায়াবতির মন্দির, বোধি বৃক্ষ, পুকুর আর স্টুপা । আমরা প্রথমেই গেলাম ভগ্নপ্রায় রানির বাসস্থান এ ।ভেঙ্গে পড়া দালান মেরামত এর কাজ চলছিল ।

ভিতরে ঘরগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য লোহার খুঁটি দিয়ে ভার সামলানোর চেস্টা করা হয়েছে ।বাইরে নতুন স্থাপনা করা হলেও মুল ঘরগুলো অবিকৃত অবস্থায় রাখা হয়েছে । চারপাশে কাঠের পাটাতন আর রেলিং দেয়া । রানি মায়াদেবী এখানেই জন্ম দিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম এর যিনি পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন করেন। এখানে সংরক্ষিত আছে গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ন।

মন্দিরের পাশে আছে বধি বৃক্ষ । পুরো চত্বরটাই প্রেয়ার ফ্ল্যাগ দিয়ে আচ্ছাদিত । স্বচ্ছ জ্বলে টলমল এক পুকুর দেখলাম যেখানে গৌতম বুদ্ধ প্রথম গোসল করেছিলেন। এরপর আমরা বের হয়ে আবার রিকশায় বসলাম । এই এলাকাটা বিশাল। বৌদ্ধ প্রধান সকল দেশের একটা করে প্যাগোডা আছে এখানে। চিন, জাপা্‌ন, মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া্‌, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দক্ষিন কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া । প্রতিটা প্যাগোডার রচনাশৈলী সে দেশের স্থাপনা নির্মাণ এর রীতিকে উপস্থাপন করেছে। এখানে আছে বিশালাকৃতির ঘণ্টা।

আরও আছে অগ্নি শিখা । এটা নাকি কোন মানুষ জ্বালায় নাই । গৌতম বুদ্ধের কল্যাণে নাকি এই আগুন অনন্ত কাল জ্বলবে। এমনটাই তাদের বিশ্বাস । বাইরে বাগানে এর সামনে সুন্দর করে খোদিত করা আছে গৌতম বুদ্ধের বানী যা পঞ্চ শিলা নামে পরিচিত। যেহেতু বিশাল এলাকা তাই অনেক্ষন সময় লাগল ঘুরতে ।আমরা এর মাঝে বাগানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম । ওখান থেকে বের হয়ে আসার পথে গেটের কাছে অনেক কিউরিও শপ আছে, চাইলে কেনাকাটা করা যায় । এরপর ফিরে এলাম হোটেল এ।

পরের দিন ফিরে এলাম কাঠমান্ডু তে কারন আমাদের কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল বিকেলে । তাই বাস নয় লুম্বিনি থেকে কাঠমান্ডু ফিরতে হয়েছে প্লেনে । ইচ্ছে করলে লুম্বিনিতে কাঠমান্ডু থেকে প্লেন আসা যায় । খরচ বেশি হলেও সময় বাঁচবে ।

নেপাল এ বাই রোড এবং বাই এয়ার এ আসা যায়। তবে বাই রোড আসতে হলে ভারতের ট্রানজিট ভিসা লাগবে। প্রথমবার ভিসা ফি দিতে হয় না। দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি থাকলেই হয় । বিমানবন্দরেই ফর্ম পূরণ করে তাৎক্ষনিক ভাবে ভিসা নেওয়া যায় । তবে একি বছরে দ্বিতীয় বার ভ্রমনে ভিসা ফি দিতে হয় ।