কসমিক সেক্স

কসমিক সেক্স এর মূল উদ্দেশ্য বাউল-ফকিরি দর্শন অনুসারে কীভাবে একজন সাধক কামের মাধ্যমে ঈশ্বরের পূর্ণ আত্মার প্রেমে পড়ে তার অপূর্ণ আত্মার মিলন ঘটায় সেটা দেখানো। এরই ধারাবাহিকতায় নির্মাতা রুহুল-সাধনা ও কৃপা-সাধনার দেহ সাধনা দেখিয়েছেন। যৌনতা এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয় নয়। তারা এখানে দেখাতে চেয়েছেন উপমহাদেশে বাউল-ফকিরদের মধ্যে কয়েকশো বছর ধরে চলে আসা দেহ সাধনাকে।

কসমিক সেক্স ছবিতে অভিনয় করেছেন ঋতুপর্ণা সেন, আয়ুষ্মান মিত্র, মুরারি মুখার্জি, ঋ্বক এবং পাপিয়া ঘোষাল। বাউলতত্ত্ব নিয়ে তৈরি ছবিতে সাহসী রি এককথায় প্রশংসার দাবিদার। ছবিটি পরিচালনা করেছে অমিতাভ চক্রবর্তী। পুতুল মাহমুদের প্রযোজনায় অমিতাভ চক্রবর্তীর পরিচালনায় এ চলচ্চিত্রের মূল বিষয় বাউল-ফকিরদের নিগূঢ় সাধনা। যাই হোক, আলোচনার আগে কসমিক সেক্স-এর কাহিনি সংক্ষেপ জেনে নিই।

বাবা ও বিমাতার সঙ্গে বাস করে মাতৃহীন যুবক কৃপা শঙ্কর রায়। একদিন গীর্জা কুমারের ব্রহ্মচারী গান্ধী অ্যান্ড হিজ উইমেন অ্যাসোসিয়েটস বইটি পড়ে সে সেক্স সম্পর্কে জানতে উৎসুক হয়ে ওঠে। আলোচনার একপর্যায়ে জোর করে বিমাতাকে জড়িয়ে ধরলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাবা। উত্তেজনায় সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দেয় কৃপা। রক্তপাতে বাবার মৃত্যু হয়েছে ভেবে ঘর থেকে দৌড়ে পালায় সে।

রাতে রাস্তায় চলতে চলতে পরিচয় ঘটে দেবী নামের এক যৌনকর্মীর সঙ্গে। সে ভালোবেসে কৃপাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। সে রাতেই স্বল্পবসনে নাচানাচির পর তাদের মধ্যে প্রেম, তারপর সঙ্গম হয়! দেবী কৃপাকে দিয়ে স্তন লেহন করান!

নতুন বিপত্তি ঘটে যখন দেবীর দালাল, যৌন প্রতিবন্ধী জোনাকি কৃপাকে দেখে পছন্দ করে। চলচ্চিত্র জুড়ে তিনি বার বার নিজেকে রাধা মনে করে কৃষ্ণ - কৃপাকে ভালোবাসতে চেয়েছেন। জোর করে চুম্বন করতে চাইলে ধাক্কা দিয়ে দোতলা থেকে জোনাকিকে ফেলে দেয় কৃপা।

মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে রাতের অন্ধকারে আবার দৌড়ে চলা! পরদিন সকালে গঙ্গায় স্নানরত এক নারীকে দেখে কৃপা তার মধ্যে মৃত মাকে খুঁজে পায়। সে নারীকে মা বলে সম্বোধন করে। যার নাম সাধনা। যিনি এক মারফতি ফকিরের কাছে লালিত-পালিত হয়ে তার কাছেই দেহ সাধনা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের দীক্ষা নিয়েছেন। যিনি শিখেছেন কামকে উপেক্ষা করে নয়, বরং কামের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব। আর এই সব দেহতত্ত্বের নানান কলাকৌশল পরম মমতায় কৃপাকে শেখায় সাধনা। চলে কৃপাকে পুনর্জন্ম দেওয়ার চর্চা।

সাধক রুহুল ফকির শিষ্য সাধনাকে দেহ সাধনার আগে এ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান দেন। সাধনা দেহ সাধনা সম্পর্কে কিছু জানে কি না সেটাও ঝালিয়ে নেন। কাহিনির ৩৭ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে টিল্ট ডাউন শটে দেখানো হয়, ঘরের উন্মুক্ত দরজার সামনে গুরু রুহুল বাবা ও সাধনা দেহ সাধনা করছেন। এ সময় সাধনা কামাতুর হয়ে উঠলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সেটা শিখিয়ে দেন গুরু।

এর পর সাধনা আর কামাতুর হয়ে ওঠেন না। গুরুর সঙ্গে দেহ সাধনায় ঈশ্বর সন্ধানে ডুব দেন। কাম সাধনা যেহেতু বাউল-ফকিরি দর্শনের প্রধান ও সর্বোচ্চ সাধনা, তাই সাধনাকে অনেক যত্ন ও ভক্তি সহকারে শেখান রুহুল ফকির।

রুহুল ফকির মৃত স্ত্রী আমেনার প্রতি ভালোবাসার কারণে পাঁচ মাইল দূরে তার গ্রামে দৌড়ান। কারণ তিনি জানতে পেরেছেন, গ্রামবাসী তার ফকিরি দর্শনে বিশ্বাসের জন্য স্ত্রী আমেনাকে কবর পর্যন্ত দিতে দিচ্ছে না। তাই কারো সাহায্য ছাড়াই কাঁধে স্ত্রীর লাশ এনে আশ্রমের সামনে কবর দেন রুহুল। একপর্যায়ে স্ত্রীর শোকে পাগলপ্রায় হয়ে ওঠেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত সে ধাক্কা রুহুল ফকির সামলাতে পারেন না। সমস্ত দর্শন ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। রুহুল হয়তো বাউল-ফকিরের সংসারত্যাগী দর্শনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণেই তার স্ত্রী, সংসারের কোনো খবর নিতে পারেননি। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি এতটুকু। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন সাধনা সবার বিরোধিতা সত্ত্বেও রুহুল বাবার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার মুখ স্ত্রী আমেনার দিকে ঘুরিয়ে দেন।

কারণ হিসেবে সাধনা বলেন, আমাদের মতো গরিব আর নীচু জাতের মানুষেরা, যারা চিরকাল ধর্মের নামে লাথিঝাঁটা খেয়ে এসেছি, লোকের অপমান শুনে এসেছি। আমার গুরুর শেষ ইচ্ছা ছিলো তার কবর যেনো এই ধর্মের নামে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়ে থাকে।

সাধনাকে দেখা যায়, বিবস্ত্র হয়ে কৃপাকে দেহ সাধনার প্রাথমিক জ্ঞান দিতে। আলোচনার একপর্যায়ে মহাত্মা গান্ধীর ব্রহ্মচর্যের প্রসঙ্গ উঠলে সাধনা কৃপাকে বলেন, মহাত্মা গান্ধীর কথা বলছো? তিনি কি কখনো গুরু ধরে নারী সঙ্গ করে নিজের ব্রহ্মচর্য পালন করেছেন? নিজের প্রকৃতিকে কী চোখে দেখতেন তিনি সেটাই আসল। প্রকৃতি ত্যাগ করে কখনো ব্রহ্মচর্য রক্ষা করা যায় না।

সাধনা তার জন্মদ্বারের দিকে ইঙ্গিত করে কৃপাকে বলেন, এখানেই মাসে মাসে জোয়ার আসে। আমাদের মাসিকের রক্ত পড়ার তিন দিন, যেদিন রক্ত পড়া কমে যায়, সেদিন ভাটির টানে এইখান থেকে নেমে আসেন স্রষ্টা, ত্রিবেণীর ঘাটে। অনেক দিনের সাধনার পর সাধক তার দেখা পান। গানের ভাষায় তাকে মনের মানুষ, সহজ মানুষ বলে।

জোনাকি বার বার কৃপাকে কাছে চেয়েও যখন পান না, তখন জোর করে কৃপাকে কৃষ্ণ হিসেবে গ্রহণ করতে চান। সাধনা বাধা দিলে জোনাকি বলেন, মাগো তুমি তো এক নারী, আমার মধ্যেও এক নারী আছে, আমারও স্নেহ-ভালোবাসা আছে, তুমি বোঝো না? আমি যে ওর প্রেমিকা। প্রেম কি শুধু শরীরের, অন্তরের নয়? ফলে জোনাকি প্রতিহিংসাবশত সাধনাকে খুন করে।

যখন এ কথাগুলো সাধনা বলতে থাকেন, তখন সাধনার দু-চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে। যতদূর মনে হয়, দেহতত্ত্বের সাধনা নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র এটিই প্রথম। এখন দেখার বিষয় অমিতাভ সেটা কীভাবে পরিপূর্ণ করেছেন; অর্থাৎ বাউল-ফকিরদের নিগূঢ় তত্ত্বকে সেলুলয়েডে তিনি কীভাবে তুলে এনেছেন।

সিনেমার প্রথম কুড়ি মিনিট দেখে সিনেমা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরের ৩০ মিনিট দমবন্ধ করে দেখেছি এবং চমৎকার লেগেছে। সিনেমার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রশ্ন উঠতে পারে অভিনয় নিয়েও। কিন্তু আমার কাছে খুব একটা খারাপ লাগেনি।

আমরা যারা সমাজে বাস করি তাদের কাছে সিনেমাটা হজম করা কষ্টকর। মা-ছেলে,বাবার প্রেমিকা,পিতা-কন্যা, পতিতা,বৃহন্নলার সাথে সেক্স।বাবা কন্যা, কিংবা মা/বাবার প্রেমিকা, কথিত মা ছেলে সম্পর্কগুলো আমাদের চোখে পবিত্র। আমরা এসব সম্পর্কে যৌনতা চিন্তাও করতে পারিনা। কিন্তু সাধকদের কাছে এসব সম্পর্ক তুচ্ছ।যদিও এটাকে ভন্ডামির কাতারে চিরকাল বলে এসেছে এ সমাজ।তাই ফকির, সাধক, সন্ন্যাসীরা যুগ যুগ ধরে সমাজচ্যুত হয়েই আছে।

পুরো সিনেমাই সেক্স নিয়ে। সেক্স নিয়ে খুব কম মুভিই আছে যেগুলো অর্থবহ। মাঝেমাঝে কিছু সিনেমায় সাধকদের ব্রম্মচর্যা নিয়ে সামান্য অংশ দেখানো হয়। কিন্তু কসমিক সেক্স পুরোটাই ব্রম্মচর্যা নির্ভর। মনের মানুষ মুভিতে লালনের জীবন কাহিনীতেও দেখানো হয়েছে সেক্স মানেই সেক্স নয়। সেক্স হলো সাধনা। সিরাজ সাইয়ের সংলাপ ছিলো, নারী যখন তোকে গ্রাস করবে কুম্ভ করবি, মনে রাখবি বিন্দু ধারন প্রেম সাধন।

কসমিক সেক্স মুভি বিন্ধুধারন নিয়েই। বীর্যপাত মানেই পুরুষের নি:শেষ হয়ে যাওয়া। বরং ধারন করাটাই পুরুষের কাজ। এবং এটা মুক্তির পথ। স্রষ্টার সাক্ষাতের পথে এগিয়ে যাওয়া। গান্ধীজীর ব্রম্মচর্যা নিয়ে অনেকে অনেক কথাই বলে। এই সিনেমাতেও বিষয়টা এসেছে। গান্ধীজী কমবয়সী মেয়েদের সাথে নগ্ন হয়ে ঘুমাতেন কেন? আমি বিশ্বাস করি সাধকদের পক্ষে ব্রম্মচর্যা অসম্ভব নয়।

ব্রম্মচর্যা মানে সেক্স থেকে দুরে থাকা নয়। বরং সেক্সকে সাধন করা। খোলা চোখে আমার আপনার কাছে এটা অসম্ভব হলেও অনেকে এই সাধনায় জীবন পার করে দিচ্ছে। সমাজের ওই ব্যাতিক্রম অংশের সাধনার একটা বিষয় নিয়েই কসমিক সেক্স।