চারুলতা ২০১১

২০১২ সালে অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায় নির্মাণ করলেন চারুলতা ২০১১। এ গল্প চৈতি বোসরূপী চারুর। তাকে কেন্দ্র করেই এ ছবিটি আবর্তিত। দাম্পত্য জীবনে চরমভাবে অসুখী, অতৃপ্ত ও নিঃসঙ্গ এক গৃহবধূ চৈতি। ঘরের সচ্ছলতা, স্বাচ্ছন্দ্য, বাহ্যিক সুখ, আর্থিক নিরাপত্তা সবই আছে। কিন্তু মানুষ হিসেবে তার চাওয়াগুলো মিলছে না কোনোভাবেই। তাই তিনি প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চান।

এ পর্বে আমরা দেখবো, অগ্নিদেবের চারুলতার বিক্রম, চৈতি, সঞ্জয়, চৈতির ভাই উৎপল, বৌদি কেয়া, কাজের মেয়ে পুষ্প ও মীরা এবং চৈতির বন্ধু অর্ণবি কে। নষ্টনীড় এর ভূপতির একশ বছর পরের প্রজন্ম বিক্রম। মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট থেকে পরিবারের প্রতি স্বামী-স্ত্রীর যে দায়িত্বের কথা বিক্রম বলেন, তা নিজেই মানতে পারেন না। মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করলেও চারদিকে একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখেন।

তার কাছে স্বাধীনতা মানে পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল শুধু নারীর জন্য। তাই স্ত্রীর প্রতি চরম মনোদৈহিক অবহেলা বিক্রমের উপলব্ধির বাইরেই রয়ে যায়। শিক্ষিত, সৎ, দায়িত্ববান, নীতিবান, আধুনিক বিক্রমের খোলসের আড়ালে বাস করে মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের আত্মকেন্দ্রিক, অসচেতন, দায়িত্বজ্ঞানহীন এক মানুষ। ভূপতির মতো তার কাছেও মানবীয় সম্পর্কে বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা সব হলেও এগুলোর আপেক্ষিকতা তিনি স্বীকার করেন না।

চারুলতার মধ্য দিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের গৃহবধূর নিঃসঙ্গতা, নারীর অসহায়ত্ব ও পরাধীনতার শক্তিশালী এক অদৃশ্য জাল এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ। একইভাবে আধুনিক নারী চৈতি বোসও পুরুষতান্ত্রিক পরিবার কাঠামোয় স্বামীর এ অবহেলা মেনে নিয়েছিলেন । সচ্ছলতা, স্বাচ্ছন্দ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, বন্ধু-বান্ধব থাকলেও স্বামীর মনোদৈহিক উদাসীনতা তাকে করেছে অসুখী, অতৃপ্ত ও একা। প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজস্ব চিন্তা ও চাহিদা অনুযায়ী তিনি চলতে চান। কিন্তু তার প্রতিপদে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেই মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা।

তেমনি আরেকজন, এ যুগের উৎপল যার কাছে জীবনের মানে দাঁড়ায় টাকা। দৃশ্যত প্রজ্ঞাবান মনে হলেও, তার জ্ঞান কোনো সৎ কাজেই লাগে না। কারণ সততা, বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের সংজ্ঞা তার কাছে আলাদা; অর্থের অভাব সবার ওপরে। তাইতো বিক্রমের সঙ্গে উৎপলের প্রতারণা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয় সেই উমাপদকেই।

এ যুগে আমরা দেখি কেয়াকে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে লড়তে জীবন দর্শন ও মূল্যবোধ হয়ে উঠেছে অর্থকেন্দ্রিক, দুর্বল ও হীনমন্য। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো কেয়া’রা কঠোর মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের অধিকারী। চৈতির একজন মেয়ে হয়ে দুই পুরুষকে একসঙ্গে ভালোবাসার কথা শুনে তাই চমকে উঠে তিনি বলেন, এ বাবা, এসব কী বলছিস তুই!

অন্যদিকে এ কালের অতি আধুনিক মানুষ সঞ্জয়। জীবন সম্পর্কে তার দর্শন, কারো জন্যই কোনো কিছু থেমে থাকে না, জীবন বয়ে চলে আপন গতিতে। স্পষ্টবাদী এ তরুণ গানের শিক্ষকটিও একসময় হয়ে ওঠেন দায়িত্বজ্ঞানহীন, স্বার্থপর। দাদার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পালিয়ে যান চৈতিকে ছেড়ে। বিগত সম্পর্ক তার ভাষায় আখ্যা পায়, এ প্রতারণা, এ অন্যায়, এ পাপ। অথচ কিছুক্ষণ আগেও তার কাছে তা পাপ ছিলো না।

আধুনিক ও স্বাধীন নারী অর্ণবি। জীবন সম্পর্কে তার ধারণা প্রয়োজন নিমিত্ত। তাই চৈতি-সঞ্জয়ের সমাজ নিষিদ্ধ সম্পর্ক তার ভাষায়, এটা কোনো অন্যায় না। তাছাড়া এটা তোর দরকার। স্বাধীনতার মানে তার কাছে সম্পূর্ণ মুক্তি; চারদিকে সীমানা একে দিয়ে তার ভিতরে ছেড়ে দিয়ে বলা হলো যেখানে খুশি যাও, এর নাম স্বাধীনতা নয়। পরিবার তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তা দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে ভিন্নতার ছোঁয়া।

স্বামী-সন্তান হারিয়ে মীরার আশ্রয় চৈতির পরিবারে। একমাত্র সন্তান যাকে তার শশুড়বাড়ির লোকেরা পুড়িয়ে মারে শুধু কন্যাসন্তান পেটে ধরার অপরাধ এ। চৈতির আরেক গৃহপরিচারিকা পুষ্প; স্বনির্ভর, সক্ষম, উপার্জনক্ষম; যার আয়ে পঙ্গু স্বামী ও সন্তানের পেট চলে। তারপরও প্রতিনিয়ত তিনি স্বামীর কাছে নির্যাতিত; তবুও পুষ্প সুখী। তার ভাষায়, তবুতো লোকটা মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে।



চারুলতা ২০১১ তে দেখি, আধুনিক বিক্রমের কাছেও মানুষের টিকে থাকার মূলমন্ত্র সেই একই সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার। বিক্রমের ভাষায়, একটি নারী এবং একটি পুরুষ, তাদের সন্তান; এই হলো পরিবার, আর দেশ বা রাষ্ট্র হলো বৃহত্তর পরিবার। এবং রাষ্ট্রের ভালোর জন্যে, দেশের ভালোর জন্যে এই পরিবারকে, মানে আমাদের নিজের নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

চৈতি প্রশ্ন করেন, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সবারই স্বাধীনভাবে বাঁচার আর স্বাধীনভাবে ভাববার অধিকার আছে বিক্রম। একটি মেয়ে, যদি সে দুটি পুরুষকে একই সঙ্গে ভালোবাসতে পারে তাহলে অসুবিধাটা কোথায়, ক্ষতি কী?’ এর উত্তরে স্বাধীনতার স্বরূপ তুলে ধরে বিক্রম বলেন, ‘স্বাধীনতার মানে কী? স্ব-অধীন, সংযম; মানুষের জীবনে যদি সংযমই না থাকলো তাহলে মানুষ দাঁড়াবে কোথায়?’ এর প্রত্যুত্তরে চৈতির মুখে আমরা কোনো কথা শুনি না।

তবে কি চৈতি বোস তা মেনে নিয়েছেন, নাকি পুরুষতান্ত্রিকতার সেই অদৃশ্য চাদর আজও আটকে দিয়েছে তার মুখ? কেননা, তার প্রশ্ন শুনেই কেয়া চমকে উঠে বলেন, এ বাবা, এ কী বলছিস তুই! সমাজের অধিকাংশ আধুনিক পুরুষই শুধু লোকদেখানো যুক্তির কারণে চৈতির এ প্রশ্নকে বাহবা জানালেও শেষ পর্যন্ত কেয়ার মতোই চমকে ওঠেন; রাঙা চোখে বলেন, এ কী ঔদ্ধত্য! এ সমাজ চৈতিদের জন্য পরিবার ছাড়া আর কোনো স্থান তৈরি করেনি।

তাই মনোদৈহিক শত অপূর্ণতা সত্ত্বেও পরিবার আঁকড়ে থাকতে চান চৈতিরা। যদিও সঞ্জয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয়, কিন্তু শেষাবধি ফিরে আসতে হয় প্রথাগত পরিবারেই; স্বাধীনতাবাদী স্বামীর কাছে। এরপরেও কি বলা উচিত হবে, চারুলতা ছিলেন পরাধীন আর চৈতি স্বাধীন?

এ যুগে দেখছি বিক্রম, উৎপল, সঞ্জয়, পুষ্পের স্বামী বা মীরার মেয়ের বর, সবাই নারীর শাসক। স্বামী অক্ষম, পঙ্গু হয়েও পুষ্পকে প্রতিনিয়ত মনোদৈহিক নির্যাতন করেন। মীরার একমাত্র মেয়েকে এ উপনিবেশিক শাসকরা পুড়িয়ে মারে, শুধু কন্যা সন্তান পেটে ধরার অপরাধে। বিক্রম, উৎপল বা সঞ্জয় নারী স্বাধীনতার কথা বললেও তারা নারীর মন ও বহির্জগতের একচ্ছত্র অধিপতি।

আমরা দেখি, বিক্রম ও উৎপলের কথার বাইরে তাদের স্ত্রীরা যেতে পারেন না, মেনে নিতে হয় সবকিছু। নিজের দুর্বলতা, অপারগতার কথা না ভেবেই চৈতির গলা চেপে ধরেন বিক্রম। এ আশঙ্কায় যে, চৈতি তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সঞ্জয় আধুনিকতার বুলি আওড়িয়ে চৈতিকে ব্যবহার করে যৌনদাসীর মতো। তারপর যখন তার পুরম্নষতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা’য় টান পড়ে, চলে যায় তাকে ছেড়ে।

এদিকে চৈতিকে দেখি দিনের পর দিন স্বামীর অবহেলা সইতে। নিজের কাম মেটাতে তাই তাকে করতে হয় স্বমেহন। সমাজ, পরিবার, মূল্যবোধের বিধিনিষেধ না শুনে সঞ্জয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেও মধ্যবিত্ত মানসিকতার চাবুকে প্রতিনিয়ত ঘায়েল হতে থাকেন চৈতি। তাই রক্ত কলুষিত হওয়ার আশঙ্কায় চৈতির গলা চেপে ধরেন বিক্রম। আর বহু কাঙ্ক্ষিত সন্তান পেটে আসার পরও তা মেনে নিতে পারেন না চৈতি। কারণ সে তো সঞ্জয়ের, বিক্রমের নয়।