কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পদ্ধতি, পাঁচালী,মন্ত্র, আলপনা, ছবি, নিয়ম

উমা কৈলাশে পাড়ি দিয়েছেন কয়েক দিন হল। মনের কোণে বিষাদ। বিজয়ার মিষ্টিমুখ, প্রণাম আর কোলাকুলিও সারা হয়ে গিয়েছে। উৎসবের মেজাজ খানিকটা যখন রং হারাতে বসেছে, ঠিক তখনই পঞ্জিকা জানান দিচ্ছে, চলে এসেছে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গিয়েছে, পুজোর তোড়জোর। কী ভাবে ঠাকুরের আসনটা সাজাবেন, কী ভাবে আলপনার দেবেন, সেই সব নিয়ে ইতিমধ্যেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করে দিয়েছেন নিশ্চই। ভোগের মেনুও ঠিক।

সেই প্রাচীন কাল থেকে সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি আর ধনসম্পদের দেবী হিসেবে লক্ষ্মীর আরাধনা প্রচলিত। আশ্বিনের কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্য বাংলার নিজস্ব সম্পদ। আশ্বিনের এই শারদ পুর্ণিমাকে কেউ বলেন কুমুদিনি পুর্ণিমা, আবার কেউ বলেন কুমার পুর্ণিমা। সারা ভারতে এই পুর্ণিমার দিনটাকে পালন করা হয় নানা ভাবে।

এই বাংলায় লক্ষ্মী যেন আমাদের ঘরের মেয়ে। তাঁকে নানা রূপে, নানা ভাবে আমরা আরাধনা করি। ঘটে, পটে, মুর্তিতে, ধানের শিষে, কলাগাছে, কুনকে ভর্তি নতুন ধানে, আর নানা ভাবে চিত্রিত সরায়। বহু বছর ধরে কোজাগরী লক্ষ্মী আরাধনার সরা চিত্রিত করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন বহু পট শিল্পী।

সে দিন বাংলার ঘরে ঘরে শঙ্খধ্বনি মুখরিত সন্ধ্যায় লক্ষ্মীর আরাধনা হলেও ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে লক্ষ্মীপুজো হয় দীপাবলির সন্ধ্যায়। গবেষকদের মতে, বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি সমাজের গভীর প্রভাব। অবশ্য তার প্রমাণও মেলে পুজোর উপকরণ আর আচার অনুষ্ঠানে।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী মর্তে আবির্ভূতা হন। তাই সারা রাত জেগে তাঁর উপাসনা করার এই রেওয়াজ। অনেকেই মনে করেন কোজাগরী শব্দটি ‘কে জাগরী’ বা ‘কে জেগে আছে’ থেকে এসেছে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে আলপনা।

পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে লক্ষ্মীপুজোর আলপনাতেও দেখা যায় আঞ্চলিকতার প্রভাব। এখনও গ্রামাঞ্চলে ঘরের দরজা থেকে দেবীর আসন, ধানের গোলা পর্যন্ত আলপনায় ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেওয়া হয়।

পুজো হয় মূলত প্রতিমা, সরা, নবপত্রিকা কিংবা কলার পেটোর তৈরি নৌকায়। একে বলে বাণিজ্যের নৌকা কিংবা সপ্ততরী নৌকা। লক্ষ্মী সরাও হয় নানা রকম, যেমন ঢাকাই সরা, ফরিদপুরি, সুরেশ্বরী এবং শান্তিপুরী সরা। নদিয়া জেলার তাহেরপুর, নবদ্বীপ এবং উত্তরচব্বিশ পরগনার বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মীসরা আঁকা হয়। তবে আঞ্চলিকতা ভেদে লক্ষ্মী সরায় তিন, পাঁচ, সাত পুতুল আঁকা হয়।

এতে থাকে লক্ষ্মী, জয়া বিজয়া সহ লক্ষ্মী, রাধাকৃষ্ণ, সপরিবার দুর্গা ইত্যাদি। ফরিদপুরের সরায় দেবদেবীরা সাধারণত একটি চৌখুপির মধ্যে থাকেন। আবার সুরেশ্বরী সরায় উপরের অংশে মহিষমর্দিনী আঁকা হয় আর নীচের দিকে থাকেন সবাহন লক্ষ্মী।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে দেখা যায় জেলা ভিত্তিক আঞ্চলিক আচার অনুষ্ঠান। এখনও ঘরে ঘরে প্রতি বৃহস্পতিবারে লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করে তাঁর আরাধনা করা হয়। উপচারে ফল মিষ্টি ছাড়াও থাকে মোয়া, নাড়ু ইত্যাদি। লক্ষ্মীর আচার অনুষ্ঠানেও দেখা যায় নানা ধরনের তাৎপর্য। কোনও কোনও পরিবারে পুজোয় মোট ১৪টি পাত্রে উপচার রাখা হয়। কলাপাতায় টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ ও হরিতকী দিয়ে সাজানো হয় পুজো স্থানটিকে।

পুজোর উপকরণ এবং আচার অনুষ্ঠান দেখে অনুমান করা যায় এর নেপথ্যে থাকা কৃষি সমাজের প্রভাব। কিছু কিছু জায়গায় লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে মেলা বসে। কোথাও বা নৌকাবাইচও অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতে লক্ষ্মীপুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। ঋগ্বেদে লক্ষ্মীর কোনও সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও শ্রী শব্দের উল্লেখ রয়েছে বেশ কয়েকবার। এখানে শ্রী অর্থে সৌন্দর্যের আধার। যদিও পরবর্তী কালে শ্রীসুক্তে অবশ্য উল্লেখ রয়েছে শ্রী নামক এক দেবীর, যিনি পদ্মের উপর দণ্ডায়মান। সেই আদি যুগ থেকেই লক্ষ্মীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে পদ্ম। তাই তিনি পদ্মাসনা, পদ্মালয়া।

যুগ যুগ ধরে লক্ষ্মীকে বিভিন্ন রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। শুক্ল যজুর্বেদে শ্রী তথা লক্ষ্মীকে আদিত্যের দুই পত্নী রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। অথর্ববেদে উল্লেখ মেলে পুণ্যালক্ষ্মী এবং পাপী লক্ষ্মীর। রামায়ণে সীতাকে লক্ষ্মী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি হল, সমুদ্রমন্থনের সময় লক্ষ্মীর আবির্ভাব।

তবে শুধু হিন্দু ধর্মে নয়, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেও উল্লেখ রয়েছে দেবী লক্ষ্মীর। যেমন বৌদ্ধ ‘অভিধানপ্পদীপিকা’-তে তিনি সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধির দেবী। তেমনই ‘শালিকেদার’ এবং ‘সিরি-কালকন্নি’ জাতকে তাঁকে সৌভাগ্য ও জ্ঞানের দেবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বৌদ্ধতন্ত্রে তিনি বসুধারা নামে পূজিত হতেন। তিনি দেবী লক্ষ্মীর বৌদ্ধ প্রতিরূপ।

অন্য দিকে জৈন ধর্মে তাঁর উল্লেখ রয়েছে মহাবীরের মাতা ত্রিশলা, যে রাতে জিনকে স্বপ্নে ধারণ করেছিলেন সেই রাতেই গজলক্ষ্মীকে স্বপ্নে দেখেছিলেন। প্রাচীন ভারতের শিল্পকলায় এমনকী মুদ্রায় দেবী লক্ষ্মীর অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন বৌদ্ধ শিল্পকলায় ভারহুত, সাচী কিংবা অমরাবতীর ভাস্কর্যে লক্ষ্মীর সন্ধান মেলে।

ভারতীয় সংগ্রহালয়ে রক্ষিত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের, বেসনগরের যে কল্পবৃক্ষ রয়েছে তাতে প্রচুর ধনসম্পদের সঙ্গে শঙ্খ ও পদ্মের চিহ্ন দেখা যায়। গবেষকদের মতে এই কল্পবৃক্ষের সঙ্গে কুবের অথবা লক্ষ্মীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রায় গজলক্ষ্মী কিংবা অভিষেক রত লক্ষ্মীর অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। লক্ষ্মী মূলত দ্বিভুজা অথবা চতুর্ভুজা হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে তিনি বহুভুজাও।

কোজাগোরী পূর্ণিমা তিথি ও দীপাবলি অমাবস্যায় ভগবতী মা লক্ষ্মীর পূজার পর কুবের দেবতা পূজিত হন । কুবের হলেন যক্ষ দের রাজা । যক্ষ শব্দটির সাথে সকলেই পরিচিত আছেন । বাংলায় একটি প্রবাদ আছে – যক্ষের ধন । কোনো বস্তুকে যখন আমরা প্রানের থেকে ভালোবেসে তাকে আগলে রাখতে যাই তখুনি এই প্রবাদটি বলা হয় । “যক্ষ” দের কাজ হোলো সম্পত্তি রক্ষা করা । আর যক্ষদের অধিপতি হলেন কুবের দেবতা । সমস্ত যক্ষেরা তাঁরই অনুগত ।

কুবের কে পুলস্ত্য ঋষির বংশধর বলা হয়। পুলস্ত্য হলেন ব্রহ্মার বংশজ । কুবেরের পূর্ব নাম ছিলো বৈশ্রবণ । প্রজাপতি ব্রহ্মার কৃপায় কুবের দেবতা একসময় লঙ্কার রাজা ছিলেন । এমনকি পুস্পক রথ তাঁর অধীনে ছিলো । তিনি ব্রহ্মার উপাসনা করে প্রজাপতি ব্রহ্মাকে তুষ্ট রাখতেন । দশানন রাবনের বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন কুবের । মহর্ষি বিশ্রশবা মুনির পুত্র হলেন কুবের দেবতা ।

লঙ্কায় কিন্তু রাজ্যপাট বেশীদিন ধরে রাখতে পারেন নি কুবের দেবতা। রাবণ ও রাক্ষসদের হাতে সেটি তুলে দিয়ে এমনকি পুস্পক রথ দশগ্রীব রাবণকে দিয়ে তিনি লঙ্কা ছেড়ে অনুচর দের সাথে কৈলাসে আশ্রয় নেন । কুবেরের হাতে দণ্ড থাকে । বাহন হস্তী বা যক্ষ ।

মা লক্ষ্মী ধন দৌলত সম্পদ প্রদায়িনী । তিনি দারিদ্র নাশ করেন । কিন্তু এবার ধন দিলেই হোলো না- পাহারা না থাকলে অপাত্রে তা লুটেপুটে খাবে । এই পাহারাদারের কাজটি করেন কুবের দেবতা । মা লক্ষ্মী ধন সম্পদ প্রদান করেন আর কুবের দেবতা রক্ষা করেন সেই সম্পত্তি । সেই জন্য এই কারনে লক্ষ্মী পূজোর পর পুরোহিত কুবের দেবতার পূজা করেন । লক্ষ্মী মাতার পূজার নিয়ম এটি । কুবের দেবতার পূজা না করলে মা লক্ষ্মীর পূজা অসম্পূর্ণ থেকে যায় । শাস্ত্রে কুবের দেবতার ধ্যান মন্ত্র উল্লেখিত আছে।

গুজরাতে এই দিনটাকে বলা হয় শারদ পুর্ণিমা। গারবা নাচের সঙ্গে মেশানো হয় রাসকে। মহারাষ্ট্রে আবার এই দিন কোজাগৃতি। যার বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়, কে জেগে আছো? বাড়ির বড় ছেলেকে এই দিন মহারাষ্ট্রে পুজো করে সবাই।

মিথিলাতে শারদ পুর্ণিমা ধুমধাম করে হয়। দেওয়ালীর শুরু হয় এই দিন। আল্পনা দিয়ে দেবী লক্ষ্মীকে আরাধনা করা হয়। এখানে লক্ষ্মীর আর এক নাম আরপিন। ওড়িশায় পূজিতা হন ধনের দেবী, গজ লক্ষ্মী রূপে। কোনও কোনও অংশে আবার শিব পুত্র কার্তিকেয়র জন্মদিন বলে, কুমার পুর্ণিমা হিসাবে পালিত হয়। এই সময়ে সারা রাত ধরে পাশা খেলার রেওয়াজ আজও আছে ওড়িশার বিভিন্ন জায়গায়।