অজানা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বৃত্তান্ত

বাঙ্গালি সংস্কৃতির আদলে চলছে নতুন বছরকে বরণ করার উৎসব ”পহেলা বৈশাখ”। বাঙ্গালি সংস্কৃতির ধারক-বাহকরা অত্যন্ত জমজমাটপূর্ণভাবে হৈ চৈ করে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়। আর এ উৎসবকে ঘিরে আমরা মুসলমান দাবিদার ভুলে যাই ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার কথা। বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে বাঁধভাঙ্গা উৎসবে মেতে ওঠেন বাঙ্গালি সংস্কৃতির ধারকরা। সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসব আমেজ, নতুন বার্তা নিয়ে পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের সূর্য উঁকি দেয় বাংলার আকাশে।

বাংলা সনের প্রথম প্রবর্তক কে? এই নিয়ে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সনের উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন, স্বাধীন বাংলার সুলতানেরা এ সনের সূচনা করেন। আবার কারো মতে, রাজা শশাঙ্ক বা আরো পুরানো কোন নৃপতি এ কাজ করেন। তবে দুটি মত বেশি পাওয়া যায়। প্রথম মত অনুযায়ী প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (৬০৬-৬৩৭) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন।

দ্বিতীয় মত অনুসারে উপমহাদেশে ইসলামী শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হত। আর হিজরি সন চন্দ্র মাসের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় তা সৌর বছরের চেয়ে ১১/১২ দিন কম হত। কারণ, সৌর বছর ৩৬৫ দিনে আর চন্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে হয়। এ কারণে চন্দ্র বছরের ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। আর বাংলার চাষাবাদ এই ঋতু নির্ভরশীল । এ জন্য সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, জ্যোর্তিবিদ ‘আমীর ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজী’কে হিজরি বর্ষ পঞ্জিকাকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রুপান্তর করতে নির্দেশ দেন।

তিনি সৌর বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রণয়ন করেন। তবে স¤্রাটের আদেশে ২৯ বছর পূর্বে ১৫৫৬ সালে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকার প্রচলনের নির্দেশ দেন। আর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল বা ৯৬৩ হিজরি সনের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এ জন্য বৈশাখ মাসকে বাংলা নববর্ষের মাস ধরা হয় এবং একে ফসলি মাসও বলা হত। কারণ, ১লা বৈশাখ এলে হালখাতা, খাজনা প্রদান ও ফসল তোলার বা বপনের মওসুম শুরু হয়।



সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ “তারিখ-ই-এলাহি” নামে শুরু হয়। তবে পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধ শেষে আকবরের সিংহাসন আরোহনের বছর ১৫৫৬ থেকে এ হিসেব শুরু হয়। সেই সময় “লক্ষ্ণণাব্দ, বিক্রমাব্দ, জালালি সন, সিকন্দর সন, সপ্তাব্দ, শকাব্দ” ইত্যাদি নামে ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল। আর পহেলা বৈশাখ নববর্ষ হিসেবে পালন হয় তার আমলেই। সে সময় বিভিন্ন পালা-পার্বনের সংখ্যা ছিল চৌদ্দটি।

তার মধ্যে একটি অন্যতম উৎসব হলো নওরোজ বা নববর্ষ পালন উৎসব। যা ১লা বৈশাখের দিনটিই সেই দিন। এই নওরোজ উৎসবের সময়েই যুবরাজ সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) মেহেরুন্নিসার (নুরজাহান) প্রেমে পড়েন। এ ভাবে বাবার নওরোজ উৎসবেই যুবরাজ খুররম (শাহ জাহান) প্রথম চোখের দেখায় হৃদয় দিয়ে ফেলেন কিশোরী মমতাজকে। এ কারণেই ইতিহাসে ‘নওরোজ’ বা নববর্ষ উৎসব অমর হয়ে থাকে।

বাংলা ক্যালেন্ডারের উৎপত্তি আরবী ক্যালেন্ডার হিজরি থেকে। ৬২২ খিস্টাব্দে বিশ্বনবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ ক্যালেন্ডারের উদ্ভব হয়। এতে মুহাররম মাসের প্রথম দিন ছিল বছরের পহেলা দিন। আর এ হিসেবে প্রথম বাংলা ক্যালেন্ডার শুরু হয় ৯৬৩ হিজরি থেকে, সেই বছরের প্রথম দিন মুহাররম মাসের প্রথম দিন। তখন বাংলায় ভূমি-রাজস্ব আদায়ের জন্য এই ক্যালে-ারকে ‘ফসলি সন’ বলা হত।

পরবর্তীতে ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসের ও দিনের হিসাব তৈরি করে। সেই হিসেব অনুযায়ী, বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিনের মাস। আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিনের মাস। আর লিপ-ইয়ারের ৩৬৬তম দিনটি যুক্ত হবে ফাল্গুন মাসের সঙ্গে। একে বলা হয় তিথি। তিথি হল চন্দ্রের পৃথিবী পরিক্রমার দিনের হিসেব। আর ৩০ তিথির অর্ধেক ১৫ হল শুক্লা। বাকি ১৫ দিন কৃঞ্চা।

পরবর্তীতে ১৪ এপ্রিল ১লা বৈশাখ পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যা অধ্যাবধি চলে আসছে। পরবর্তীকালে বাংলা মাসের নাম কিভাবে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ হয় তা জানা যায় নি। তবে ধারণা করা হয় ‘শক রাজ বংশের’ স্মরণার্থে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত ‘শকাব্দ’ থেকে তারকা ভিত্তিক এ নামগুলো এসেছে। যেমন- ১.বিশাখা থেকে বৈশাখ ২.জ্যোষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ ৩. কর নক্ষত্র থেকে আষাঢ় ৪. শ্রাবণী নক্ষত্র থেকে শ্রাবণ ৫.ভদ্রপদ নক্ষত্র থেকে ভাদ্র ৬. আশ্বনী নক্ষত্র থেকে আশ্বিন ৭.কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক ৮. অগ্রহায়ণী থেকে অগ্রহায়ণ ৯.পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ ১০. মঘা নক্ষত্র থেকে মাঘ ১১.ফাল্গুনি থেকে ফাল্গুন ১২.চিত্রা থেকে চৈত্র।

অনুরূপভাবে বাংলা বারের নামগুলো সম্রাট শাহ জাহান পর্তুগীজ পণ্ডিতের সহায়তায় ইউরোপীয়দের ব্যবহৃত রোমান নামকরণ পদ্ধতির সঙ্গে অনেকটাই মিল রেখে তৈরি করেন।

বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে কৃষি সংস্কৃতি কে বোঝায়। কারণ আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ। বাংলার ৮০% মানুষ কৃষির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। কৃষক জীবনের আনন্দ, বেদনা, উৎসব, আশা-নিরাশার সঙ্গে ফসল ও ফসলী বছরের নিবিড় বন্ধন থাকবে এটা স্বাভাবিক জ্ঞানেই বোঝা যায়। তাই চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি কৃষি নির্ভর বাঙালির জীবনযাত্রার মানদণ্ড।