১০ হাজার ফুট ওপর দিয়ে অরুণাচলের তাওয়াং ভ্রমণ

সকালে ৯টা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম আসাম অরুণাচল সীমান্তে অবস্থিত ভালুকপঙ এর উদ্দেশ্যে। মাঝে একটা জায়গায় লাঞ্চ সারলাম। কয়েক কিমি যাওয়ার পর একটা মোড় থেকে গাড়ি বাঁদিকে ঘুরল, সোজা রাস্তাটা কাজিরাঙ্গা হয়ে শিবসাগর, জোড়হাট, ডিব্রুগড় হয়ে তিনসুকিয়া চলে গেছে। একটু পরেই ব্রহ্মপুত্রের ওপর কালীভমরা ব্রিজ এলো।

বিরাট চওড়া ব্রহ্মপুত্রের মাঝেও অনেক জায়গায় বালির চরা পড়েছে। ব্রিজ পেরিয়ে আসামের তেজপুর শহর। সেখান থেকে ভালুকপং পৌছাতে বিকাল হয়ে গেলো, গাড়ি থেকে হোটেলের সামনে নামার সময় হাল্কা ঝিরঝিরে বৃষ্টিও শুরু হলো। হোটেলটার অবস্থান খুব সুন্দর জায়গায়, কার পারকিং থেকে কয়েক ধাপ নীচে নেমে মেইন গেট, সেটা ছাড়িয়ে সোজা গেলেই রেলিং দেয়া খোলা বাগান।

রেলিং এর সামনে এলে নীচে আকা বাকা বমডিলা যাওয়ার রাস্তা আর তার নীচে কামেং নদী বয়ে চলেছে, এর স্থানীয় নাম জিয়াভরলি। নদীর ওপারে ছোট ছোট টিলা আর গভীর জঙ্গল, অনেকটা ডুয়ার্সের মতো। সন্ধ্যা নামছে, আজ আর কোথাও যাওয়ার নেই, তাই সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে রুমে চলে গেলাম।

পরদিন আমাদের গন্তব্য বমডিলা হয়ে দিরাং। যেহেতু তাওয়াং অবধি গিয়ে আবার ফেরার রাস্তাটা একই তাই আমরা যাওয়ার সময় বমডিলাতে না থেকে আরো 42 km এগিয়ে দিরাং এ গিয়ে থাকব। বমডিলাতেও থাকব কিন্তু সেটা ফেরার সময়। ভালুকপং থেকে এগিয়ে পথে পড়লো টিপি অর্কিড রিসার্চ সেন্টার। বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড ছাড়াও, এখানের সংরক্ষিত অরণ্যে বিরল প্রজাতির উদ্ভিদও স্থান পেয়েছে।

অনেক বড় জায়গা, সব দেখা সম্ভব নয়, আমরা সামনের কয়েকটা গ্যালারি ঘুরে দেখলাম। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, বেশ ভালো লাগলো এখানে কিছু সময় কাটিয়ে। এরপর আবার গাড়ি ছুটে চলল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে। সামনে রাস্তার ধারে একটা মন্দিরের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়ালো। দুর্গা মন্দির, আমরা নামলাম, ভিতরে গিয়ে প্রণাম করে এলাম। আমাদের ড্রাইভার ভিকিও ভিতরে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রন্নাম করে এলো। গাড়িতে উঠে বলল যে এই মন্দির খুব জাগ্রত আর এই রাস্তা দিয়ে যত গাড়ি যায়, সব গাড়িই এখানে থামে, আরোহী ও ড্রাইভার সবাই প্রণাম করে তবেই পাহাড়ে উঠে। এতক্ষণ পাহাড়ের পাশ দিয়ে গাড়ি চলছিল, এখান থেকেই পাহাড় চড়া শুরু হল ।

এগিয়ে চলতে লাগলাম দিরাং এর দিকে সুন্দর পাহাড়ি পথ ধরে, রাস্তাটা মোটামুটি সোজা। পাশে নীচে দিয়ে একটা নদী বয়ে চলেছে। আস্তে আস্তে উচ্চতা বাড়তে লাগলো, তাঁর সাথে হাল্কা ঠাণ্ডাও। প্রায় ২ঘণ্টা পর ৮২০০ ফুট উচ্চতায় বমডিলা এসে পৌছালাম, বেশ সুন্দর ছোট পাহাড়ি শহর। শহর ঠিক বলা যায় না, জনপদ বা টাউন বলা যেতে পারে। আমরা এখানে ফেরার সময় থাকব, তাই না থেমে এগিয়ে চললাম দিরাং এর উদ্দেশ্যে। বমডিলার কথা পরের ভাগে বলব।

দিরাং এসে পৌছালাম বিকেল ৫টা নাগাদ, প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। দিরাং এর মার্কেট চত্বরটা বেশ জমজমাট। সন্ধ্যা বেলায় মনে হচ্ছে যেন হাট বসে গেছে, ভালই ভিড় রয়েছে। ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসের দোকান, সুন্দর হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফার্নিচারের দোকান, মুদির দোকান, গাড়ির শো রুম থেকে শুরু করে শাকসবজি সবই পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখানে ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস সবই আছে।

হোটেলও অনেকগুলোই চোখে প্রল।দিরাং মার্কেটের ব্যাপ্তি খুব বেশি নয়, এটা পেরিয়ে একটু এগোলেই আবার সব ফাকা। দিরাংও খুব বড় জায়গা নয়। পরদিন চললাম দিরাং এর উষ্ণ প্রস্রবণ দেখতে। কয়েক কিমি গিয়ে ভিকি গাড়ি দাড় করালো। পাশেই একটা পাথুরে সিঁড়ি নেমে গেছে, সেটা দিয়ে নামতে শুরু করলাম, কিছুটা পথ আবার সমান। প্রায় ৫০০ মিটার যাবার পর গন্তব্যে পৌঁছলাম।

এখানে চারদিকের পরিবেশটা একদমই প্রাকৃতিক, শুধু সবুজ আর সবুজ, সামনেই নীচে কামেং নদীর চওড়া উপত্যকা তাঁর ওপর পারে ধাপে ধাপে সবুজ ধানের ক্ষেত, দূরে দূরে কিছু ছোট বাড়িও আছে আর তাঁর পিছন থেকে পাহাড় উঠে চারদিক ঘিরে রেখেছে প্রাচীরের মতো। দিরাং ভ্যালীর এই অপরূপ সৌন্দর্যের কথা আগেই শুনেছিলাম, আজ সেটা নিজেই চাক্ষুষ করলাম।

১২-১৩ ফুটের একটা ছোট পাথুরে গর্ত, গভীরতা ফুট তিন চার এর বেশি হবে বলে মনে হল না। তাঁর মধ্যে জলের গভীরতা দেড় থেকে দুই ফিট। এটাই উষ্ণ প্রসবন। এখানে জলে সালফার থাকায় সেটা ত্বকের জন্য খুবই ভালো। এর একপাশে একটা ফাটল দিয়ে কলের জলের মতো গরম জল নীচে পড়ছে, সেখানে দাড়িয়ে দু-একজন স্নানও করছে। পাশেই একটা জায়গায় অনেক ধুপকাঠি লাগানো রয়েছে, স্থানীয় লোকের কাছে এটা বেশ পবিত্র। কিছু ছবি তুলে ফিরে চললাম গাড়ির দিকে।

বেশ ওপরে অনেকটা জায়াগা নিয়ে বেশ সুন্দর করে সাজানো গোছানো চারপাশটা। রাস্তার দুইপাশে ঘাসগুলো চৌকো চৌকো ব্লকে দাবার বোর্ডের মতো সুন্দর করে কাটা। এখানে একটা আর্মি ক্যান্টিন আছে, ভিতরে বেশ ঝা চকচকে টীইলস বাধানো, ভিতরে প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল পাতা, চারদিকে কাচের দেয়াল থেকে বাইরের অপরূপ দৃশ্য দারুন লাগছে। খাওয়া দাওয়া সেরে আধঘণ্টা পর বেরিয়ে পড়লাম। কিছু পর্যটককে দেখলাম এখানের আর্মি স্টোরে থেকে বিভিন্ন জিনিস কিনতে। কম দামে বিভিন্ন ছোট ইল্কেকট্রনিক্স জিনিস, পারফিউমস, বিভিন্ন্ বিদেশি ব্র্যান্ডের পানীয় ইত্যাদি এখানে অনেক কম দামে বিক্রি করছেন জওয়ানরা।

আবার চলতে লাগলাম। উচ্চতার সাথে সাথে ঠাণ্ডাও বাড়তে পারে। চারদিকে হঠাৎ করে মেঘে ঢেকে গেলো, তারই ফাক দিয়ে খুব কাছেই তুষার শৃঙ্গের উপস্থিতি অনুভব করলাম। ভিকি বলল যে আমরা এবার সেলা পাশের দিকে এগোচ্ছি। সম্পূর্ণ পাথুরে রাস্তা, একদিকে নেড়া পাহাড় উঠে গেছে আর ওপর দিকে গভীর খাদ। চারদিক কুয়াসাছন্ন, হাল্কা ঝিরঝিরে বৃষ্টিও পরছে, তুষারপাতের জন্য অনুকুল পরিবেশ। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম যদি তুষারপাত দেখার সৌভাগ্য হয় তো। একটু এগোতেই সামনে রাস্তার ওপর একটা ফটকের সামনে এসে হাজির হলাম। ঘড়িতে সময় বেলা ১টা।

চলেছি মোটর যানে সর্পিল পথ ধরে ধরে পাহারের ভাঁজে ভাঁজে ঘুরেঘুরে। একদিকে খাদ পেতেছে মৃত্যু-ফাঁদ অন্যদিকে পাহাড় ছুঁয়েছে আকাশ। চলেছি দুর্গম পথ ধরে একরাশ ভয় সীমাহীন আনন্দ আর ভরপুর উত্তেজনা নিয়ে। দুচোখে মুগ্ধতা, আর বিষ্ময় এখনও অনেক পথ দিতে হবে পাড়ি তাতেকি! প্রকৃতির দান, আহা মরি মরি। যেতে যেতে এসে গেল শেলা পাশ। পাহাড় দিয়ে ঘেরা চারি ধার মাঝ খানে ঠান্ডায় জমে থাকা সরোবর শন শন শন বয় ঠান্ডা বাতাস গায়ে বেঁধে যেন কাঁটা চারিধারে কুঁচি কুঁচি বরফেতে রাস্তা ঘাট সব রয়েছে ঢাকা।

ফটকের পাশে একটা সাইন বোর্ডে লেখা আছে শেলা পাশ। পাশেই একটা মহাদেব মন্দির, আর ছোট একটা বৌদ্ধ চোর্তেন রয়েছে। আসেপাশের পর্বতশৃঙ্গগুলি ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ফটক পেরিয়েই রাস্তার পাশে একটা ছোট ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। আবার ঝির ঝির করে বৃষ্টিও শুরু হোল, আমরা নেমে ঐ ক্যাফেটেরিয়াতে ঢুকলাম, ভিতরে দেখলাম ভালই ভিড়। এটা একমাত্র দোকান আর গাড়ি তিন চারটে এসেছে, তাই সব লোক তাঁর ভিতরেই আশ্রয় নিয়েছে। একটু পরে বৃষ্টি কমার পর বাইরে এলাম। তুষারপাত আর হল না। রাস্তার পাশেই সেলা লেক, চারপাসে ইতস্তত বরফ জমে রয়েছে। কিছু ছবি তোলার পর চলতে শুরু করলাম আবার।

ঘণ্টা দেড়েক পর এসে পৌছালাম জাঙ্গ শহরে, এটাই ছোট একটা জনপদ, বড় শহর নয়। এখান থেকে ডানদিকে একটা রাস্তা দিয়ে ২কিমি গেলেই পরবে নুরানাং জলপ্রপাত, যেটা হোল অরুণাচলের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত। ভিকি বলল যে তাওয়াং থেকে ফেরার সময় এটা দেখাবে, তাই আমরা সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম।

একটু পরেই এসে পৌছালাম যসবন্তগড়। শহীদ যসবন্ত সিং রাওয়াত, গাড়োয়াল রেজিমেন্টের রাইফেলম্যান, এর স্মৃতিসৌধ রয়েছে এখানে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে চীন ভারত যুদ্ধের সময় বীর বিক্রমে সম্পূর্ণ একা লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন তিনি। শুধুমাত্র ২জন স্থানীয় মেয়ে সেলা আর নুরা এবং একজন গ্রাম্য মহিলা বুমলা তাকে সাহায্য করেছিলেন। সেই ঘটনায় পরে আসছি। চারদিক এখানে ঘন কুয়াশায় ঢাকা, তাঁর সাথে হাল্কা বৃষ্টিও চলছে।

১০ ফুট দুরেই কিছু আর দেখা যাচ্ছে না। এখানে ভারতীয় সেনার তরফ থেকে পর্যটকদের বিনামুল্যে চা খাওয়ানো হয়। সাথে সামোসাও আছে তবে টাকা দিয়ে ওটা কিনতে হবে। চা খাওয়ার পর ভিকি বলল যে এখানে এখন সময় নষ্ট করে লাভ নেই, এখনো অনেকটা রাস্তা যেতে হবে, সবা জায়গায় রাস্তা ভালো নয়, সন্ধ্যার মধ্যে তাওয়াং পৌছাতে না পারলে আসুবিধা হবে। ফেরার সময় আবার এখান দিয়েই তো ফিরব, তখন এখানে সময় নিয়ে দেখা যাবে। আমরা সেটাই ঠিক হবে বলে মনে করলাম।

পথের শোভা দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে চলতে লাগলাম তাওয়াং এর দিকে। উঁচু পর্বতের মাঝখান দিয়ে আকা বাকা পথ, চারপাশে অসংখ্য প্রজাতির মহীরুহের অরণ্য, তাঁর বুক চিরে পথ চলে গেছে। অসাধারণ অনুভূতি। বিকেল ৫টা নাগাদ একটা পথের বাঁকে গাড়ি থামল। কয়েকটা দোকান রয়েছে, চা, অমলেট, ম্যাগী, চাউ, মোমোও আছে। এখানেও পরিবেশটা খুব সুন্দর।

সামনেই রাস্তাটা বাঁক নিয়ে সুউচ্চ ২টো পর্বতের মাঝে বেকে গেছে, সেই পর্বতচুড়ার গায়ে গুটিকয়েক মেঘ এসে দাড়িয়ে রয়েছে, আকাশে গোধূলির রং ধরেছে, দেখতে দারুণ লাগছে, এক কথায় অনবদ্য। প্রকৃতির অসাধারন রূপ দেখতে দেখতে বাইরে দাড়িয়েই চা আর তাঁর সাথে এক প্লেট করে মোমো খেলাম। আবার চলতে শুরু করলাম, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, চারপাশে জঙ্গলাকীর্ণ পথ, হেডলাইট জ্বেলে আমাদের গাড়ি চলতে লাগলো। এই রাস্তায় গাড়ি খুব কম চলতে দেখলাম, হাতে গোনা কয়েকটা টুরিস্ট গাড়ি, পণ্য বোঝাই ট্রাক আর আর্মিদের গাড়ি এবং ট্রাক।

আবার যাত্রা হলো শুরু বাকি আছে এখনও চড়াই-উতরাই যেতে হবে পাহাড়ের গায়ে গায়ে, নইলে বিপদ শমন হাতে রয়েছে দাঁড়িয়ে। ক্রমে ক্রমে পথ হলো শেষ ঐ দেখা যায় সুন্দরী তাওয়াং অদুরে। নীল আকাশ সবুজে ঢাকা পাহাড় আর ধব ধবে সাদা সাদা বরফে মিলে মিশে একাকার, তার মাঝে রয়েছে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শহর সুন্দরী তাওয়াং। চারিদিকে বিছানো শুধুই বরফ গাছপালা মাঠ ঘাট এমনকি বাড়ির ছাদ ঝরনার জল সেও জমে হয়েছে বরফ পাহাড়ের গা বেয়ে নামা তার গিয়েছে থেমে। নিসর্গের অপরূপ শোভা মনোহর বুকে নিয়ে রয়েছে দাঁড়িয়ে সুন্দরী তাওয়াং।

প্রায় সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তাওয়াং এসে পৌছালাম। সন্ধ্যা ৭ টাতেই দেখলাম দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে, রাস্তাঘাটও ফাকা ফাকা, যেন রাত ১০টা বাজে! ভিকি বলল এখানে এরকমই নিয়ম, জনসংখ্যা কম এবং একদম চীন সীমান্তে হবার জন্য আর্মিদের কড়াকড়ি ইত্যাদি অনেকটা নিরাপত্তাজনিত কারণে সন্ধ্যার পরে লোকজন বাইরে থাকে না। যাইহোক আমরা হোটেলে পৌঁছে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘরে গিয়ে গা এলিয়ে দিলাম।

কাল রাতে দেখতে পাইনি, আজ সকালে তাওয়াং এর প্রাকৃতিক রুপ দেখে মন ভরে গেলো। বুঝলাম যে কেন তাওয়াং কে ভারতের সুন্দরতম শৈলশহর বলা হয়। চারদিক তুষারাবৃত পর্বতমালা দিয়ে ফাকা, ছিমছাম, সবুজে ছাওয়া তুলনামুলক ভাবে অনেকটাই বিস্তৃত সাজানো শহর তাওয়াং। এটাকে জনপদ বলব না, কারন এর বিস্তৃতি অনেকটাই, এক পাহাড় থেকে ওপর পাহাড়ে ছড়িয়ে আছে অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকারভাবে। পশ্চিম থেকে শুরু হয়ে উত্তর দিক ঘুরে পুর্ব দিকে এসে সেহ হয়েছে। তিনটে পাহাড় জুড়ে এর অবস্থান। একদম পশ্চিমভাগে রয়েছে ভারতের বৃহত্তম ও এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম তাওয়াং মনাস্ট্রি। মধ্যভাগে মুল শহর, হোটেল, বাজার, স্থানিয়দের বাড়ি, ব্যাংক, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদি সব এখানেই। আর একদম পূর্ব বা শেষ ভাগে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া।

প্রথমেই এলাম তাওয়াং মনাস্ট্রিতে। মূল মন্দিরটিকে ওপরে রেখে চারদিক থেকে ধাপে ধাপে নেমে আআসা ছোটবড় অনেক বাড়ি নিয়ে একত্রে এই মনাস্ট্রি। প্রায় ৫০০ লামা এখানে থাকতে পারে। গেট পেরিয়ে ভিতরে আসতেই ডানদিকেই রয়েছে একটি সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম। প্রাচীন মুখোস, ধাতব এবং পাথরের বাসনপত্র, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, বিশাল বড় শিঙা, দুন্দুভি হাতির দাত থেকে প্রাচীন পুঁথি, বুদ্ধমুর্তি, প্রস্তরখন্ড, প্রাচীন মুদ্রা, লামাদের পোশাক, বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র, বিশাল বড় হাড়ি-কড়াই সবই আছে এখানে।

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে একটা বড় পাথুরে চাতাল পেরিয়ে প্রবেশ করলাম মূল বুদ্ধমন্দিরে। নীচের মূল দ্বার বন্ধ রয়েছে, ভিতরে লামাদের মন্ত্রচ্চারন চলছে। পাশের একটা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। ওপরে উঠে রেলিং ঘেরা বারান্দা মতো আছে। নীচে লামাদের বসে মন্ত্রচ্চারন, গ্রন্থপাঠ চলছে আর তাঁর সাথে শিঙা দুন্দুভি বাজানোও চলছে। সামনেই ২৬ ফুট উঁচু সোনালী বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধের হাতে রয়েছে একটু ভিক্ষাপাত্র। স্থানীয়রা বলেন যে কেউ যদি ওপর থেকে কয়েন ছুড়ে একবারেই ঐ পাত্রে ফেলতে পারেন তো তাঁর মনবাসনা পূর্ণ হবে। আমি চেষ্টা করলাম কিন্তু লক্ষ্যভ্রস্ট হলাম, আমার মনস্কামনা যে এত সহজে পূর্ণ হবে না জানাই ছিল। যাইহোক একটু পরেই বাইরে বেরিয়ে এলাম।

এবার এলাম মনাস্ট্রি পেরিয়ে একদম শেষ প্রান্তে, এখানে একটা বড় চোর্তেন রয়েছে। সেটার পিছনে গালিচার মতো সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিশাল মাঠ ঢালু হয়ে সামনের দিকে নীচে নেমে গেছে, তাঁর ওপর পারে উঁচু পর্বতএর মাথা মেঘে ঢাকা, তাঁর ফাক দিয়ে ছুঁচাল চূড়াগুলো বেরিয়ে আছে, অনেক নীচে আঁকাবাকা রাস্তাগুলো সুতোর মতো পাহাড়ের গায়ে যেন কেউ পেচিয়ে রেখেছে। চোখ জুড়ানো দৃশ্য। এখানেও কোয়লা সিনেমার একটা গানের শুটিং হয়েছিল, জায়গাটা পরে ঐ গানটা দেখে মিলিয়ে নিয়েছিলাম।

এরপর এলাম ওয়ার মেমোরিয়াল দেখতে। চীন ভারত যুদ্ধের সময় নিহত শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি হয়েছে এই স্মৃতিসৌধ। প্রত্যেক নিহত জওয়ানদের নাম এখানে সোনার অক্ষরে খোদাই করে লেখা আছে। ভিতরে গেলাম, সব পর্যটকরা একত্রিত হবার পর একজন জওয়ান ৬২ সালের যুদ্ধের ঘটনাবলি বলতে লাগলেন। সামনেই রাস্তা, চেকপোস্ট, বর্ডার সব দেখানো আছে। আমরা রুদ্ধশ্বাসে শুনতে লাগলাম যে কিভাবে চীনা সেনারা এই স্মৃতিসৌধ অবধি দখল করে নিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর ঐতিহাসিক ঘটনার থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

ওয়ার মেমোরিয়াল এর ঠিক উল্টোদিকের পাহাড়েই তাওয়াং মনাস্ট্রি দারুণ লাগছিলো। এরপর হোটেলে ফিরে এলাম। আজ আর কোথাও যাওয়ার নেই। লাঞ্চ করতে করতে বিকেল ৩টে হয়ে গেল। খেয়ে দেয়ে উঠে ভাবলাম এখানে তো তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়, তাই ভাবলাম এখন হোটেলে বসে থেকে কি করব, একটু হেটে আসি। সবাই ঘরে বিশ্রাম করতে গেলো আর আমি ক্যামেরার ব্যাগটা কাধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম একাই। কোথাও গিয়ে ক্যামেরা কাধে নিয়ে হেটে হেটে একা ঘুরতে কেমন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা আছে, সেই জায়গাটার সাথে সেখানের মানুষজনের সাথে বেশ একাত্ম মনে হয় নিজেকে । মনে হয় যেন সবাইকে ডেকে বলি, ওহে শোনো, আমিও তোমাদেরই একজন।

যাইহোক হেটে হেটে বাজার ছাড়িয়ে অনেকটাই চলে এলাম। এদিকটায় চারদিকে ঘিঞ্জি বাড়িঘর, রাস্তা বেকে নীচে নেমে গেছে, সেইদিকেও তাই। কিন্তু আমি এসেছি প্রকৃতির খোজে, তাই পথ পারিবর্তন করে ওপর দিকে উঠতে লাগলাম। আমাদের হোটেলের কাছে একটা জায়গায় রাস্তাটা দুইভাগ হয়ে দুইদিকে চলে গেছে। বাদিকের রাস্তাটা হোটেলের সামনে দিয়ে বাদিকে বাঁক নিয়ে পাহাড়ি বস্তির দিকে চলে গেছে আর ডানদিকের রাস্তাটা হোটেলের পিছন দিয়ে ঘুরে ওপরে উঠেছে।

পাশ দিয়ে একটা সিঁড়িও দেখলাম যেটা সোজা ওপরে উঠে ঐ রাস্তায় মিলেছে। আমি সিঁড়ি দিয়েই ওপরে উঠে এলাম। রাস্তাটা একটু সামনে গিয়ে বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের মোড়ে গিয়ে একটা সুন্দর দৃশ্য দেখে আভিভুত হয়ে গেলাম। রাস্তার ধারে একটা উঁচু বেদি মতো জায়গায় বসে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে তাঁর উপদেশ প্রদান করছেন। না না আমি স্বপ্ন দেখছি না কিম্বা বাস্তবে নয়, মূর্তি বানানো রয়েছে। কিন্তু এত সুন্দর যেন জীবন্ত!

এখান থেকে সোজা রাস্তা ধরে অল্প কিছুদূর গিয়ে একটা নির্মীয়মান বিশাল বড় বুদ্ধমুর্তির সামনে পৌছে গেলাম। বুদ্ধ পদ্মাসনে স্থিত হয়ে আছেন আর তাঁর বসার সিংহাসনটা একটা মনাস্ট্রি। মানে ঐ মনাস্ট্রির ওপর বুদ্ধমূর্তিটা তৈরি হচ্ছে। মনাস্ট্রির সামনে গেলাম, কিন্তু গেট বন্ধ। তাই ভিতরে যেতে পারলাম না। এখান থেকে নীচে তাওয়াং শহরটাকে ছবির মতো লাগছিলো, ঠিক নিচেই আমাদের হোটেলটার ছাদটা দেখা যাচ্ছে।

একদম নাক বরাবর উল্টোদিকের পাহাড়ের গায়ে সুবিশাল তাওয়াং মনাস্ট্রি আর তারও পিছনে গাঢ় নীল রঙের পাহাড় যেন আকাশ ছুয়েছে। জায়গাটা এত ভালো লাগছিলো তাই রাস্তার ধারে চুপচাপ প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে লাগলাম। একটু পরেই কোথা থেকে ধোয়ার মতো সাদা মেঘ এসে সব ঢেকে ফেলতে শুরু করল, যেন বলতে লাগলো দিনের শেষে এবার ঘুমের দেশে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আলো কমে আসছে, কিছু ছবি তুলে হোটেলে ফিরে আসলাম। পরদিন আমাদের দ্রষ্টব্য পি টি সোঁ লেক এবং সাঙ্গেতসর লেক বা মাধুরী লেক।

আজকে দুটি জায়গা দেখার আছে। একটি হচ্ছে মাধুরী লেক। যার আসল নাম শাংগেতসার লেক। রাকেশ রোশন পরিচালিত কোয়েলা ছায়াছবির ‘তানহাই তানহাই তানহাই… দোনোকো পাস লে আই…’ গানটির শুটিং এই লেকে হয়েছিলো। এরপর থেকেই লেকটির আসল নাম হারিয়ে ধীরে ধীরে মাধুরী লেক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ভূমি জরিপ অনুসারে ১৯৫০ সালে এক ভূমিকম্পের ফলে উদ্ভূত বন্যা থেকে এই লেকের উৎপত্তি। এই লেক দেখার জন্য আপনার তাওয়াং আসার দরকার নেই হয়ত কিন্তু আপনি তাওয়াং এলে শাংগেতসার লেকটিকে এক নজর দেখে যাবেন।

তাওয়াং শহর থেকে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। লেকটি যেমন সুন্দর দেখতে যাওয়ার পথটিও তেমন সুন্দর। আমরা চললাম আরো দূরের পথে। জাং ফলস দেখতে। জাং জলপ্রপাতের আসল নাম ছিলো নুরানাং ফলস। এখন জাং ফলস নামেই পরিচিত। অপূর্ব সুন্দর এই জলপ্রপাত। পাহাড়ের গা বেয়ে, এঁকেবেঁকে চলা পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা যখন জাং ফলসের কাছে পৌঁছলাম তখন যেন ভাষা হারিয়ে ফেললাম। এত সুন্দর ঝর্না এর আগে কোথায় দেখেছি মনে পড়ে না। প্রায় ঘণ্টা খানেক সময় কাটালাম সেখানে।

কত রকম ছবিই না তুললাম। এই ঝর্নার কাছেই একটি রিসোর্ট আছে। পাহাড়ের চূড়ায়। সে রিসোর্টের বারান্দা থেকে পুরো ঝর্না আর খরস্রোতা ঝিরি নজরে আসে। অপূর্ব! এই বারান্দায় বসে আমরা সবাই কফি খেলাম। কিছুটা সময় জিরিয়ে ভ্রমণের ক্লান্তি একটু দূর হতেই ফেরার পথ ধরলাম।

তাওয়াং-এ ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইলাম। হোটেলে ছাদে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো রাতের তাওয়াং শহর দেখে নিলাম। পরদিন সকালেই আমরা তাওয়াং ছেড়ে যাচ্ছি। পেছনে পরে রইলো হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার এক অজানা উপাখ্যান।



কাজিরাঙ্গা এবং অরুণাচল প্রদেশ (বমডিলা–তাওয়াং সার্কিট)

১ম দিনঃ ট্রেনে গুয়াহাটি, সেখান থেকে বাসে তেজপুর অথবা সরাসরি ফ্লাইটে তেজপুর পৌঁছানো। গাড়িতে/বাসে কাজিরাঙ্গা। হোটেলে চেক ইন। বিকেলে জিপ সাফারিতে জঙ্গল ভ্রমণ। রাত্রিবাস কাজিরাঙ্গায়।

২য় দিনঃ সকালে হাতির পিঠে অরণ্যভ্রমণ, লোকাল সাইটসিয়িং, বিকেলে জিপ সাফারিতে জঙ্গলে। রাত্রিবাস কাজিরাঙ্গায়।

৩য় দিনঃ কামেং / জিয়া ভরলি নদীর তীরে ভালুকপং-এ পৌঁছানো। নদীতে নৌকায় ভ্রমণ। রাত্রিবাস ভালুকপং-এ।

৪র্থ দিনঃ ভালুকপং থেকে দিরাং-এর দিকে রওনা। পথে টিপি অর্কিডিয়াম (রবিবারে বন্ধ) দেখে নেওয়া। টেঙ্গা ও রূপা উপত্যকা পেরিয়ে শেষা ঝরনা দেখে বমডিলায় দুপুরের খাওয়া। বমডিলা আপার মনাস্ট্রি দেখে নিয়ে সন্ধ্যায় দিরাং-এ পৌঁছানো। রাত্রিবাস দিরাং-এ।

৫ম দিনঃ দিরাং-এ সাইট সিয়িং (সাংতি উপত্যকা, দিরাং মনাস্ট্রি ইত্যাদি)। রাত্রিবাস দিরাং-এ।

৬ষ্ঠ দিনঃ দিরাং থেকে তাওয়াং-এর পথে রওনা। পথে চুগ উপত্যকা, হট স্প্রিং, দিরাং ওয়ার মেমোরিয়াল দেখে সে লা পাসে পৌঁছানো। এরপর যশবন্তগড় ওয়ার মেমোরিয়াল, নুরানাং জলপ্রপাত হয়ে সন্ধ্যায় তাওয়াং পৌঁছানো। রাত্রিবাস তাওয়াং-এ।

৭ম দিনঃ তাওয়াং সাইটসিয়িং (তাওয়াং মনাস্ট্রি, হ্যান্ডিক্র্যাফট সেন্টার, তাওয়াং ওয়ার মেমোরিয়াল, আনি মনাস্ট্রি)। রাত্রিবাস তাওয়াং-এ।

৮ম দিনঃ তাওয়াং থেকে তাকসাং মনাস্ট্রি, জুং ঝরনা, সাঙ্গাসার লেক, ওয়াই জাংশন, পিটি সো লেক এবং বুমলা পাস বেড়িয়ে নেওয়া। রাত্রিবাস তাওয়াং-এ।

৯ম দিনঃ একই পথে তাওয়াং থেকে দিরাং হয়ে বমডিলায় ফেরা। হ্যান্ডিক্র্যাফট সেন্টার (রবিবারে বন্ধ) ঘুরে নেওয়া। রাত্রিবাস বমডিলায়।

১০ম দিনঃ বমডিলা লোয়ার মনাস্ট্রি দেখে তেজপুরে ফেরা। রাত্রিবাস তেজপুরে।

১১শ দিনঃ তেজপুর থেকে সরাসরি ফেরার ফ্লাইট অথবা গুয়াহাটি ফিরে ট্রেন ধরা।

বি.দ্রঃ দিরাং থেকে তাওয়াং যেহেতু একইপথে যাতায়াত সেহেতু পথে দ্রষ্টব্যগুলি একবারে না দেখে কয়েকটা ফেরার সময়েও দেখে নেওয়া যায়। হাতে সময় থাকলে দিরাং-এ আর একদিন থেকেও কিছুটা দেখে নেওয়া যায়।

বুমলা পাসে যেতে অনুমতিপত্র লাগবে। তাওয়াং-এ পৌঁছে এব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে।